বাংলাদেশের অবিনাশী আমলাতন্ত্র

আবদুল মান্নান
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০০:০০
বাংলাদেশের অবিনাশী আমলাতন্ত্র
শুরুতেই বলে রাখি এই লেখা আমলার বিরুদ্ধে নয়, এটি একটি সর্বনাশা আমলাতন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ। এই বিষয়ে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা চলে আসতে পারে। তা-ও কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে নয়। এই বয়সে কিছু সত্য কথা প্রকাশ করে যেতে না পারলে পরবর্তী জীবনে শান্তি পাব না।

আমলা ছাড়া কোনো দেশের প্রশাসন চলবে না। একজন আমলা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু একজন আমলা যখন তাঁর ওপর নির্ধারিত দায়িত্বের পরিবর্তে নিজস্ব মতামত আর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেন, তখন সর্বনাশা আমলাতন্ত্রের জন্ম হয়। এ বিষয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
১৯৭২ সালের ৩০ মার্চ বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বুদ্ধিজীবীদের এক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন, ‘এত দিন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হইতে মানুষ সৃষ্টি হয় নাই, এক ধরনের আমলাই কেবল সৃষ্টি হইয়াছে।’ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ আইআইএম-আহমেদাবাদে এক ছাত্র সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা আমলাতন্ত্র।’ এই দুজন মহান ব্যক্তির বক্তব্যের মাধ্যমেই বোঝা যায় তাঁরা আমলা নন, আমলাতন্ত্র সম্পর্কে কথা বলেছেন।
এই দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অনেক আমলার অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।

১৯৭১ সালে নূরুল কাদের পাবনার জেলা প্রশাসক ছিলেন। মেহেরপুরের এসডিও (পদটি বর্তমানে বিলুপ্ত) ছিলেন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনে এই দুই আমলার অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের জনক বলা হয় প্রয়াত নূরুল কাদেরকে। তাঁর নামের শেষে ‘খান’ শব্দটি ছিল, যা তিনি এফিডেভিট করে বাদ দিয়েছিলেন।
কারণ এই নামের সঙ্গে একটি পাকিস্তানি গন্ধ আছে বলে তিনি মনে করতেন। যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশি প্রবাসী সরকারের পক্ষে বিদেশে পাকিস্তানি দূতাবাসের যে কয়জন কর্মকর্তা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তাঁরা সবাই পাকিস্তানের ফরেন সার্ভিসের আমলা ছিলেন।
বাংলাদেশের অবিনাশী আমলাতন্ত্রব্রিটিশ ভারতে শাসকগোষ্ঠীর সহায়তা করতে উঁচু পর্যায়ের রাজ কর্মচারীরা আসতেন ইংল্যান্ড থেকে। তাঁদের ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) সদস্য বলা হতো। ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধের (সিপাহি বিপ্লব) পর সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে ভারতীয়দেরও আইসিএস অফিসার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। শুরুতে সেই সংখ্যা ছিল প্রতি ব্যাচের ৫ শতাংশ এবং তা-ও শুধু বাংলা থেকে। ১৮৬৩ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান নিজস্ব সিভিল সার্ভিস তৈরি করে। তবে এতে কোনো বাঙালির প্রবেশ ছিল খুবই দুরূহ। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আমলে প্রথম এই সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে একটি অধ্যাদেশবলে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে আমলাদের দৌরাত্ম্য দেখেছেন এবং তিনি নিজে যেভাবে তার শিকার হয়েছেন, সে কারণেই তিনি আমলাদের আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে বঙ্গবন্ধু এই কাজে যে সব সময় সফল হয়েছেন, তা বলা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনামলের শুরুতে যে দুটি কমিশন সৃষ্টি করেছিলেন, তার মধ্যে একটি ছিল পরিকল্পনা কমিশন, অন্যটি শিক্ষা কমিশন। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় গুণ ছিল, তিনি কাকে দিয়ে কী কাজ হবে, তা বুঝতে পারতেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান নিয়োগ করেছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নূরুল ইসলামকে। সদস্য ছিলেন ড. মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অধ্যাপক আনিসুর রহমান। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে এই চার প্রথিতযশা শিক্ষক অসামান্য অবদান রাখছিলেন। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে ফিরে কমিশনে সদস্য হিসেবে যোগ দেন একজন আমলা। শুরু হয় শিক্ষকদের সঙ্গে আমলার নীতি বিষয়ে মতপার্থক্য। তারও আগে একাধিক আমলার সঙ্গে কমিশনের সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের সূত্রপাত হয়। কমিশনের শিক্ষক সদস্যরা বুঝতে পারেন এই সবজান্তা আমলাদের ডিঙিয়ে তাঁদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে তাঁরা মানসম্মান নিয়ে সরে পড়তে শুরু করেন। এসব কথা অধ্যাপক নূরুল ইসলাম তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘An Odyssey : The Journey of My Life’ গ্রন্থে লিখে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় যে কমিশনটি করেছিলেন তা ছিল শিক্ষা কমিশন, যা কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই এই কমিশন গঠিত হয়। সদস্যসংখ্যা ছিল ১৮। সবাই শিক্ষক বা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। ছিলেন না কোনো আমলা। বাংলাদেশে আমলারা আমলাতন্ত্র কায়েম করার সুযোগ পান মূলত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর, যদিও তাঁর শাসনকালেই তাঁরা শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন। তাঁরা সেই সময় তেমন বড় ধরনের কোনো সুবিধা করতে না পারলেও তাঁদের অনেকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম ছিলেন একজন আমলা—মাহবুবুল আলম চাষী। ১৯৭৪ সালে যখন দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয়, তখন খাদ্যসচিব ছিলেন আবদুল মোমেন খান। তিনি বঙ্গবন্ধুকে খাদ্যের মজুদ বা প্রাপ্যতা বিষয়ে সব সময় সঠিক তথ্য দিতেন না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি জিয়ার খাদ্য উপদেষ্টা ও মন্ত্রী হয়ে দীর্ঘদিন এই পদে বহাল ছিলেন। তাঁর এক সন্তান বর্তমানে বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা।

জিয়া যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন প্রয়োজন ছিল কিছু আমলার সহায়তা। কারণ তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। সঙ্গে নিলেন বেশ কিছু সামরিক-বেসামরিক আমলা। তাঁরাই জিয়াকে সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে পরিচালিত করতেন। যেহেতু উপদেষ্টা বা মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের প্রশাসনিক কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, সেহেতু তাঁরা তাঁদের সব কর্মকাণ্ডের জন্য আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। দেশে জেঁকে বসে আমলাতন্ত্র, যা থেকে এখনো বাংলাদেশের প্রশাসন মুক্ত হতে পারেনি। এই আমলাদের অনেক সিদ্ধান্তের কারণে সরকারকে নিত্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। আবার এই আমলাদের অনেকেই অসাধারণ অনেক কাজ করেছেন, যা মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নে যিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর কাছে মানুষ চিরদিন ঋণী হয়ে থাকবে। আবার একজন আমলা প্রকল্প পরিচালক কত অপরিপক্ব হতে পারেন, বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের অবস্থা তার উদাহরণ।

সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রণালয় প্রায়ই নানা কারণে সমালোচনার শিকার হয়, যার অন্যতম কারণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি থাকেন, তাঁর অভিজ্ঞতার অভাব। তেমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সেসব মন্ত্রণালয়ে আমলারা তাঁদের তন্ত্র কায়েম করেন। তাঁরা মন্ত্রীদের অসহায় করে ফেলেন। মানুষ কিন্তু মন্ত্রীকে দেখেন, আমলাকে নয়। আরেকটি বড় গলদ হচ্ছে, যে ব্যক্তির যে বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই, তাঁকে সেই দায়িত্ব দেওয়া। এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের, বিখ্যাত গায়ক নচিকেতার একটি জনপ্রিয় গানের কথা মনে পড়ছে। তাঁর সেই গানের এক স্থানে তিনি বলছেন, ‘আজকে যিনি কয়লামন্ত্রী, কালকে দেখেন শিক্ষা।’ নচিকেতা এটি তাঁর দেশের মন্ত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা অনেকাংশে আমলাদের সম্পর্কে বলা যায়। এ বিষয়ে কয়েক দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিক প্রথম পৃষ্ঠায় বড় ধরনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যাতে তারা দেখিয়েছে দেশের কতগুলো গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান আমলারা। এসব প্রতিষ্ঠানে কেন আমলার পরিবর্তে কোনো গবেষক প্রধান হবেন না, যে কাজটি বঙ্গবন্ধু করতে পেরেছিলেন? পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার দৌড়েও একাধিক আমলা এগিয়ে আছেন।

এখন একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাঠকদের জানাতে চাই। চার বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব এবং সাড়ে চার বছর একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত বাস্তবমুখী আমলার সহযোগিতা পেয়েছি, যাঁদের কাজ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আবার উল্টোটিও আছে। অন্যান্য দেশের মতো মঞ্জুরি কমিশনকে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে একে হায়ার এডুকেশন কমিশনে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের (অবশ্যই আমলা) তিনি কাজ শুরু করার নির্দেশ দিলেন। বলে দিলেন হায়ার এডুকেশন কমিশনের জন্য প্রণীত আইন যেন বঙ্গবন্ধুর করা কমিশনের ১৯৭৩ সালের আইনের সঙ্গে কোনো অবস্থায়ই সাংঘর্ষিক না হয়। কমিশন একটি খসড়া তৈরি করল। সচিব কমিটির সঙ্গে এই খসড়া নিয়ে নিত্যদিন সভা হয়। দীর্ঘ সময় পর একটি খসড়া সচিব কমিটি প্রস্তুত করে, যা ছিল একটি আমলা পুনর্বাসনের দলিল। বলা হলো, কমিশনের চেয়ারম্যানও একজন আমলা হতে পারবেন। বিষয়টি নিজে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়ে বললে তা তিনি বুঝতে পারেন। এই খসড়া আইনে পরিণত হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে বাধ্য হতেন। এটিই সম্ভবত তন্ত্রে বিশ্বাসী আমলারা চাইছিলেন। আর একবার আমলারা সিদ্ধান্ত নিলেন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের সব অর্থ বিলি করা হবে। আমার অস্ত্র বঙ্গবন্ধুর করা ১৯৭৩ সালের আইন। সেই আইনে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ করা সব অর্থ মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বিলি করা হবে। বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে জানালে তিনি আমলাদের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছিলেন। এমন উদাহরণ আরো উল্লেখ করতে গেলে লেখার কলেবর শুধু বড় হবে।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমানে আমলারা হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী। কর্মজীবনে তাঁরা যত রকমের সুযোগ-সুবিধা পান, সেই সুবিধা অন্য কোনো পেশার মানুষের পাওয়ার সুযোগ নেই। আমলারা সাধারণত কখনো অবসরে যান না। অবসরের পর কেউ হন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, কেউ যান রাষ্ট্রদূত হয়ে আবার কেউ কেউ ঢুকে পড়েন রাজনীতিতে। সরকারের বিভিন্ন কমিশনের সদস্য পদ তো আছেই। আমলাদের একটি অংশ পাড়ি জমায় বিদেশে স্থায়ীভাবে নতুন জীবন শুরু করতে। তাঁদের যদি তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতেও সরকারের চলার পথ তেমন একটা মসৃণ হবে না।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

Add a Comment