ষড়যন্ত্র থেমে নেই

আবদুল মান্নান
২০ আগস্ট, ২০২৩ ০০:০০
ষড়যন্ত্র থেমে নেই
জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব রয়েছে, যার অন্যতম হচ্ছে দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনে অনেক দেশই ব্যর্থ হয়েছে, যার অন্যতম কারণ শাসকগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর রাষ্ট্রের এই দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ নামের দেশটি একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। এটি শুরু জেনারেল জিয়ার আমলে।

সেই ধারাবাহিকতা ছিল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালেও। পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পর যদিও খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছিলেন, বাস্তবে এর পেছনে ছিল জিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থন। জিয়ার অনুগতরাই কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল। পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর তথাকথিত সিপাহি-জনতার বিপ্লবের নামে বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ একাধিক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছিল জিয়ার অনুগতরা।
জিয়া ১৯৭৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অজুহাতে প্রায় দেড় হাজার বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যকে বিনা বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁদের লাশও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেননি। প্রখ্যাত মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী আন্দ্রে গুন্দার ফ্রাংক তাঁর ‘Crisis in the third world’ গ্রন্থে লিখেছেন, জিয়াই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ডের সূচনা করেন। পিতা জিয়ার পথ অনুসরণ করে পুত্র তারেক রহমান রাষ্ট্রের পুরো প্রশাসন যন্ত্রকে ব্যবহার করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, সংসদে তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড মেরে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
ষড়যন্ত্র থেমে নেই ২০০১ সালে বেগম জিয়া জামায়াতের সহায়তায় বাংলাদেশে সরকার গঠন করেন।

তিনি সরকারপ্রধান হলেও তাঁর পুত্র তারেক রহমান একটি সমান্তরাল সরকার চালু করেন। সদর দপ্তর স্থাপন করেন বনানীর ‘হাওয়া ভবনে’। সেখানে বসে তারেক রাষ্ট্রের সব ব্যাবসায়িক চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত। এক পর্যায়ে তারেক রহমান হয়ে ওঠেন মিস্টার টেন পার্সেন্ট। ক্রমান্বয়ে লোভ তাঁকে গ্রাস করতে শুরু করে।
তারেকের চিন্তা কিভাবে তাঁর এই সুখের দিন প্রলম্বিত করা যায়। তা করতে হলে পিতার পথ অনুসরণ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সামনে একমাত্র পথের কাঁটা আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে নির্বাচনে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রশাসন ও পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৬ সালে তা সম্ভব হবে তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সরাতে পারলেই হলো। এই চিন্তা সফল করতে হাওয়া ভবনেই স্থাপন করা হলো অপারেশন হেডকোয়ার্টার। গঠন করা হলো একটি পরামর্শক কমিটি। এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাকুল হায়দার চৌধুরীসহ আরো একাধিক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। সিদ্ধান্ত হয়, এই কাজে ব্যবহার করা হবে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদকে। বাছাই করা হয় হরকাতুল নেতা মুফতি হান্নানকে। এর আগে হান্নান ফরিদপুরের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সভাস্থলে ৭৬ কেজির বোমা পুঁতে তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। হান্নান আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে মানুষ হত্যার কাজে বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত।
জঙ্গিদের সঙ্গে খালেদা জিয়া ও বিএনপির সখ্য ছিল সব সময়। তারেক রহমানই প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিএনপি ও জামায়াত একই পরিবারের সদস্য। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি হরকাতুল নেতা মুফতি শহিদুল ইসলামকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০১ থেকে ২০০৪ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থান হয়েছিল জেএমবি ও হিযবুত তাহরীরের মতো ভয়াবহ সব জঙ্গি সংগঠনের। আফগানিস্তান থেকে জঙ্গি ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসে তারা প্রকাশ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিল।

শেখ হাসিনাকে হত্যার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। পাকিস্তানের সমরাস্ত্র কারখানা থেকে জোগাড় করা হয় সেনাবাহিনীতে ব্যবহার্য আর্জেস গ্রেনেড। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে ধরা পড়ে ১০ ট্রাক অত্যাধুনিক অস্ত্র, যার গন্তব্য ছিল ভারতের আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা। এসব অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চোরাপথে আসামে যেত তারেক রহমানের মাধ্যমে। কিছুদিন আগে ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনারেল গগনজিৎ সিং ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তা বিস্তারিত বলেছেন। বলেছেন, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রীয় মদদে অস্ত্রের এমন চোরাচালান তখন হয়ে উঠেছিল নিয়মিত। তারেকের পক্ষে যেকোনো ধরনের অস্ত্র জোগাড় করা অসম্ভব ছিল না। ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেয়, তারা জিপিওসংলগ্ন স্থানে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শান্তি সমাবেশ ও পরে মিছিল করবে। আবেদন করা হয় ঢাকার পুলিশ প্রশাসনের কাছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দুনিয়া থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান। আবদুস সালাম ও তাঁর ভাই তাজউদ্দিনের মাধ্যমে মুফতি হান্নানের কাছে পৌঁছে যায় আর্জেস গ্রেনেড। ২০ তারিখ পর্যন্ত পুলিশের কাছ থেকে সমাবেশের কোনো অনুমতি মেলে না। সিদ্ধান্ত হলো, সমাবেশ হবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। স্থান পরিবর্তনের তথ্যটি সব জাতীয় দৈনিকে ২১ তারিখ বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়।

অনুষ্ঠানের দিন দুপুর থেকেই সমাবেশস্থলে দলীয় নেতাকর্মীরা আসতে থাকেন। একটি খোলা ট্রাককে বানানো হয় মঞ্চ। শেখ হাসিনা বিকেল ৪টার কিছু পরে সমাবেশস্থলে পৌঁছেন। সঙ্গে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। আগে পৌঁছে গিয়েছিল হরকাতুল নেতা হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা। সবার কাছে আর্জেস গ্রেনেড। আজই শেখ হাসিনার শেষ দিন। যেকোনো রাজনৈতিক সমাবেশে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন থাকে। এদিনও যথারীতি ছিল, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রধান রেজাকুল হায়দার সবাইকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন সভা শুরুর আগেই তারা যেন স্থান ত্যাগ করে। তারা তা-ই করেছিল। ঢাকার সব হাসপাতালের ইমার্জেন্সির ডাক্তারদের দুপুরেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতা শেষ করে ট্রাক থেকে নামবেন, ঠিক এমন সময় চারদিক থেকে শুরু হলো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। চারদিক রক্তাক্ত মানুষের দেহের ছড়াছড়ি। কেউ মৃত আর কেউ বা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এ ঘটনায় স্তম্ভিত সারা দেশ, সারা বিশ্ব। তারেক রহমান হাওয়া ভবনে বসে অপারেশনের খবর নিচ্ছেন।

পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও অন্যান্য নেতা এক থানা থেকে আরেক থানায় দৌড়াদৌড়ি করছেন। কোনো থানা তাঁদের মামলা নিচ্ছে না। সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বললেন, ‘তাঁকে (শেখ হাসিনা) কে মারবে? তিনি ব্যাগের মধ্যে করে সেখানে গ্রেনেড নিয়ে তা ব্যবহার করে বিএনপিকে বদনাম করার ষড়যন্ত্র করছেন।’ ঘটনার পর সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রুমি খালেদা জিয়ার কাছে গিয়েছিলেন ঘটনার তদন্ত করার অনুমতি চাইতে। খালেদা জিয়া বলেন তার কোনো প্রয়োজন নেই। আদালতে যখন এ ঘটনার মামলা চলছিল, মেজর জেনারেল রুমি তখন সেখানে সাক্ষ্য দিয়ে তা প্রকাশ করেন।

পরদিন অকুস্থলের সব আলামত পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দেওয়া হলো। আন্তর্জাতিক মহলের চাপে পরে ২০০৫ সালে আটক হয় মুফতি হান্নান ও তাঁর বেশ কিছু সহযোগী। এরই মধ্যে সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক, যা বর্তমানে সবার জানা। বিচারপতি জয়নাল আবেদিনকে প্রধান করে গঠন করা হয় একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। তিনি তাঁর প্রতিবেদনে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে পাশের একটি দেশ (পড়ুন ভারত) জড়িত। মুফতি হান্নানের গ্রেপ্তারের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিল একটি চৌকস তদন্তদল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেয়ে তারা নিরাশ হয়ে ফেরত গিয়েছিল। এক-এগারোর পর ২০০৮ সালে মুফতি হান্নানের বিচার শুরু হয়। বিচারকার্যের সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল হান্নান ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর আদালত কর্তৃক দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর আগে হান্নান তাঁর সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ, হাওয়া ভবনে তাঁর নিয়মিত আসা-যাওয়া, শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনাসহ সব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করে যান। অথচ বিএনপি মহাসচিবসহ দলের অন্যান্য নেতা নিয়মিত বলে বেড়ান, এ ঘটনার সঙ্গে তাঁদের দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেখ হাসিনাকে হত্যা করার অপচেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত, তাঁকেই নেতা মেনে বামপন্থী-ডানপন্থী সবাই এক পতাকা দলে একত্র হয়েছেন। তাঁদের মদদ জোগাচ্ছে বাইরের কিছু অপশক্তি।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

Add a Comment