সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ

আবদুল মান্নান
২৩ জুলাই, ২০২৩ ০০:০০
সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ
শিশু জন্মের সময় ধাত্রী বা চিকিৎসক দক্ষ ও যোগ্য না হলে শিশু বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একটি শিশুর জন্মের সময়টা যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক একইভাবে একটি রাজনৈতিক দলের জন্মের মুহূর্তটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশু বিকলাঙ্গ হলে পরিবারের কষ্ট হয় আর কোনো একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম সুস্থ ও সুষ্ঠুভাবে না হলে একটি জাতিকে তার খেসারত দিতে হয়। বিএনপি নামের দলটির ক্ষেত্রে এটি শতভাগ প্রযোজ্য।

বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব দল সক্রিয়, তার মধ্যে শুধু দুটি রাজনৈতিক দলের জন্ম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়েছিল। প্রথমটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর অন্যটি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙে মওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম ঔপনিবেশিক শাসনামলে।

দলটি পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এই দলটিকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতো একটি হঠকারি দর্শন প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এই দেশের রাজনীতিতে জাসদ নামের দলটির জন্ম হয়েছিল। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ— কোনোটাই টিকে থাকেনি।
খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে মুসলিম এলিটদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ। সেটি এখন বিস্মৃত।
সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের ১৮ জন সদস্যসহ হত্যা করার ৮৬ দিনের মাথায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। জিয়া ছিলেন খুবই চতুর।

তিনি ক্ষমতা দখলের আগে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মী খন্দকার মোশতাককে দিয়ে বেশ কিছু কুকর্ম করিয়ে নেন। যার মধ্যে ছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি, সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহকে সরিয়ে নিজে ওই পদটি দখল করা, কারা অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার ব্যবস্থা করে ঘাতকদের দেশত্যাগের সুযোগ করে দেওয়াসহ তাদের নানাভাবে পুরস্কৃৃত করা। ঘাতকরা দেশ ত্যাগের আগে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের বিচারের সব পথ বন্ধ করে মোশতাককে দিয়ে জারি করান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, যা পরবর্তীকালে জিয়া সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে আইনে রূপান্তর করেন। খুনের বিচার করা যাবে না, এমন আইন বিশ্বে আর কোনো দেশে হয়েছে বলে জানা যায় না। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে লেখা দেশের পবিত্র সংবিধানে জনবিরোধী ধারা সংযোজন জিয়ার আমলে শুরু।
জিয়া ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেন। দেশে সান্ধ্য আইন জারি করে তাঁর দেশ শাসন শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে জিয়া কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া এককভাবে একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন, যে নির্বাচনে শুধু তিনি একমাত্র প্রার্থী, যা ‘হাঁ’ ‘না’ ভোট হিসেবে পরিচিত। একই কাজ পাকিস্তানের প্রথম সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খান করেছিলেন। কোনো কোনো কেন্দ্রে জিয়া শতভাগ ভোটের বেশি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বর্তমান সময়ে জিয়ার দল ও তাদের বিদেশি প্রভুরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র গেল গেল বলে নিয়মিত রব তুলছে। তারা কি এই ইতিহাস জানে না?

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই যে জিয়া দেশ ও সংবিধানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তা এখনো থামেনি। খালেদা জিয়া একই পথে হেঁটেছেন। এরশাদের রাজনীতিতেও কোনো ভিন্ন দর্শন ছিল না। জিয়া অনেকটা বাধ্য হয়ে নিজের জীবন রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এটি মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত জিয়া বাঙালি নিধনের জন্য আনীত পাকিস্তানি অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থিত ‘সোয়াত’ জাহাজের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এসব তথ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর রফিক বীর-উত্তম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল অলি বীরবিক্রমের বইয়ে বর্ণিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়া যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন তখন তিনি কমপক্ষে তিনবার তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়াকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে লোক পাঠান। খালেদা জিয়া তখন পাকিস্তানি সেনা অফিসার জেনারেল জানজুয়ার হেফাজতে অবস্থান করছিলেন। খালেদা জিয়া পাকিস্তানি সেনাদের আতিথেয়তা ছেড়ে জিয়ার কাছে যেতে অস্বীকার করেন। এই জানজুয়া পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হিসেবে যখন মৃতুবরণ করেন তখন খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি সব রীতি-নীতি ও প্রটোকল ভঙ্গ করে জানজুয়ার মৃতুতে শোকবার্তা পাঠান। এটি ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম অপমান।

১৯৭৭ সালে জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি দখল করার পর প্রধান সেনাশাসকের পদটিও দখল করেন। জিয়া যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তামাশা মঞ্চস্থ করেন, তিনি তখন সেনাবাহিনী প্রধান। দেশ তখন সামরিক আইনের অধীনে। সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়া শুধু সংবিধানবিরোধীই নয়, রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। জিয়া এই কাজটি অনায়াসে করেছেন। জিয়া সম্ভবত বিশ্বে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের মতো তিনটি পদ দখল করেন। রাষ্ট্রের সব শীর্ষ পদ কুক্ষিগত করার পর জিয়ার খায়েশ হলো তিনি একটি রাজনৈতিক দল করবেন। শুরু হলো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম। এরপর জিয়া গঠন করেন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট-জাগোদল আর সব শেষে বিএনপি। এসব অপকর্মের জন্য তিনি ব্যবহার করেন তাঁর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে।

১৯৭৯ সালে সেনা শাসনের অধীনেই জিয়া দেশে একটি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বেশির ভাগ আসনে এগিয়ে থাকা অবস্থায় টিভিতে ফল প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রেডিও-টিভিতে ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসনে বিজয় লাভ করে। বাকি আসন জিয়ার দল বিএনপি ও তার মিত্ররা ভাগ করে নেয়। সেই সংসদে জিয়া প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন শাহ আজিজের মতো একজন স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধীকে। এই শাহ আজিজ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। জিয়ার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় জয়পুরহাটের কসাই নামে খ্যাত আবদুল আলিমের। এই আবদুল আলিম জয়পুরহাটে অসংখ্য মাড়োয়ারি, সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হত্যার জন্য দায়ী ছিলেন।

বিএনপি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মনেপ্রাণে কখনো বিশ্বাস করেনি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সুযোগ পেলেই বলেন, বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তান ভালো ছিল। আর গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল ‘বাই চান্স’ পাওয়া স্বাধীনতা। এর চেয়ে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য আর কিছু হতে পারে না। দলের একজন খণ্ডকালীন নেতা, যিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী, একাধিকবার বলেছেন বর্তমান সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে, কারণ যাঁরা এই সংবিধান রচনা করেছিলেন তাঁদের তা রচনা করার যোগ্যতা ছিল না। দেশের সংবিধান নিয়ে এমন ঔদ্ধত্ব্যপূর্ণ বক্তব্য অন্য কোনো দেশে সম্ভব নয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এই আশায় যে তিনি ঢাকার মেয়র হচ্ছেন, তা ছিল গুড়ে বালি। সম্প্রতি দলের আরেকজন নেতা মির্জা আব্বাস বলেছেন, তাঁরা বিচারপতি খায়রুল হকের (সাবেক প্রধান বিচারপতি) সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। এই নেতার এতটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই বিচারপতি খায়রুল হক কোনো সংবিধান রচনা করেননি। তাঁর সভাপতিত্বে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ৯ সদস্যের একটি বেঞ্চ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) রায় দিয়েছিলেন। আর এই নেতার এটাও জানা উচিত, সংবিধানের কোনো ধারার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের, অন্য কারো নয়।

এই মুহূর্তে তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বা ‘শেখ হাসিনা হঠাও’ আন্দোলনের নামে বিএনপি ও তার মিত্ররা যা করছে তা কোনো সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি নয়। তা হচ্ছে দেশ, সংবিধান আর ৩০ লাখ শহীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী সব মানুষের যৌথ প্রচেষ্টা এমন অপকর্ম রুখে দিতে পারে। আর বিএনপিরও মনে রাখতে হবে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি কানাডার ফেডারেল কোর্ট তাদের দলের একজন কর্মীর সেই দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বাতিল করে দিয়ে বিএনপিকে একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। একজন ভয়ানক ব্যক্তি হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ। বিএনপির সুযোগ এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের যে পরিচিতি বর্তমানে আছে তা থেকে বের হয়ে সুস্থ ও সুষ্ঠু ধারার রাজনীতিতে ফেরা।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

Add a Comment